সম্পাদকীয় সংবাদ

রাজনৈতিক ও জননেতৃত্ব শূন্য নোয়াখালী!

বিশেষ প্রতিনিধি, নোয়াখালীঃ

2020-04-09 10:36:12


নূরুল আলম মাসুদ:

নোয়াখালী কতটা রাজনৈতিক ও জননেতৃত্ব শূন্য তা কভিড-১৯ আবারো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এই শূন্যতা যে নতুন তা কিন্তু নয়- বরং বহু পুরনো বিষয়টা আবারো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে করোনা মহামারী। চলতি সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকটে এখানকার মানুষ তাদেরকে ঘিরে কোন নেতা এবং নেতৃত্বের নির্দেশনা, পরিকল্পনা এমনকি কাউকে সকাশেও পায়নি।

অবশ্য, এরমধ্যে নোয়াখালী পৌরসভায় মেয়র মহামারী করোনাকে ঘিরে একটি সক্রিয় নেতৃত্বের উদাহরণ সামনে এনেছেন। বেগমগঞ্জ, কোম্পানিগঞ্জ এবং কবিরহাট পৌরসভাতে একধরণের নেতৃত্ব দেখা গেছে।

কিন্তু, বাদবাকী রাজনৈতিক নেতৃত্ব? সামাজিক-সাংস্কৃতিক-সুশীল নেতৃত্ব? আদৌ তারা কোন ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন? এই বৈশ্বিক মহামারীতে আমাদের এই নেতৃত্বগুলো কোথায় আছেন— কেমন আছেন তারা? আমরা জানি না

অনেকে হয়তো বলবেন, এই নেতা দান করছেন- আরেক নেতা ত্রাণ দিচ্ছেন- অমুক নেতা রিলিফের তালিকা করছেন। শিট। এইসব সামাজিক-রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিত কাজ- বিশেষত: মান্ধাতার আমলীয় রাজনৈতিক নেতাদের ওয়ে অব থিংকিংটাই এমন।এটা নেতাগিরি, নেতার কাজ। কিন্তু, নেতৃত্ব এক্কেবারে আলাদা জিনিস।

নেতৃত্ব জিনিসটা একটা প্রক্রিয়া.। এটা একজন নেতা কি করলেন, কি ঘোষণা দিলেন সেটা নেতৃত্ব না। সমাজবিজ্ঞানে এটা নিয়ে আলাদা করে ব্যাপক পড়াশোনর বিষয় আছে, আমরা বরং সেদিকে না যাই। শুধু সহজে বলে রাখি, নেতৃত্ব এমন একটি প্রক্রিয়া যারা মধ্যদিয়ে মানুষ যেন কোন অসাধারণ ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান রাখতে পারে সেই পথ তৈরি এবং সমন্বয় করে, এখানে একক নেতা বগল বাজানোর সুযোগ নাই।

ধরুন, করোনার শুরু পর থেকে ডাক্তাররা প্রায় সব ধরণের রোগী দেখা বন্ধ করে দিলেন, একদম ঘোষণা দিয়ে— হাউ ডেয়ার দে আর! বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগী দেখা বন্ধ করে দিলেন- কত অমানবিক এবং জঘন্য কাজ! জেলায় একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে হাসপাতালগুলোকে নিয়ম মতো চলার জন্য নির্দেশনা দিবে— কিন্তু আমাদের সেই নেতৃত্ব আসলে কই— যেটি জনস্বার্থে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিবেন ?

৩৫ লাখ মানুষের প্রধান হাসপাতাল- সদর হাসপাতাল, কিন্তু সেখানে রোগী দেখা, রাখা, চিকিৎসার কোন ভালো ব্যবস্থা নেই। নোয়াখালীর ডাক্তাররা প্রথম দিকে পিপিই’র জন্য রোগী দেখতে পারছিলেন না। কিন্তু, আমাদের সঠিক জননেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকলে প্রথমেই এই সমস্যা সমাধান করা যেত। গাজীপুরের মেয়র দেখিয়ে দিয়েছন— চাইলে আপনি করোনা পরীক্ষার কিটও নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু আমাদের সেই নেতৃত্ব আজো ঘুমন্ত।

প্রবাসী অধ্যুষিত নোয়াখালী জেলা। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখের বেশি। গত তিনমাসে বিদেশ থেকে ফিরেছে প্রায় ২৮ হাজার মানুষ, সেই সাথে সরকারি ছুটি ঘোষনার পর বাড়ি আসছে আরো লাখ খানেক। তো এদের কেউ একজনও যদি করোনা আক্রান্ত হয় পরীক্ষা করার কোন ব্যবস্থা এখানে নাই। কিন্তু এই জেলায় পরীক্ষাগার থাকা জরুরি, যা আরো কয়েকটি জেলার হাব হিসেব কাজ করতে পারতো। ইতোমধ্যে বাজারে খবর আসছে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ তথা আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ করোনা টেস্ট ল্যাব করতে চায়। কিন্তু, ঘুরেফিরে সেই পুরানো কথা— করোনা পরীক্ষা ল্যাব তৈরির অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনবেন আসলেই আমাদের সেই নেতৃত্ব কই?

নোয়াখালী দক্ষিণে ব্যাপক অংশ চরাঞ্চল এবং কৃষিপ্রধান। তরমুজ জমিতে পেকে পড়ে আছে। কিন্তু, আর বহু জায়গার মতো আমরা কৃষকদের বাজারগুলো ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে পারতাম- বিকল্প বাজার ব্যবস্থাপনায়; কিন্তু, ফের সেই একই কথা- আমাদের সেই নেতা কই? শুধু নোয়াখালী শহরেই ৪০টির বেশি হাসপাতাল, প্যাথলজি আছে। কিন্তু কোন আইসিইউ নেই। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে বাচ্চাদের জন্য আইসিইউ করার মতো সব ধরণের ইক্যুইপমেন্ট আছে- তবু তা গড়ে উঠেনি। কারণ সেই নেতৃত্ব; হাসপাতালগুলো সঠিকভাবে গভার্ন করার মতো আমাদের চৌকষ নেতৃত্ব এখনো তৈরি হয়নি।

এক ইউপি সদস্য রিলিফের চাল চুরি করে ধরা খেয়েছেন। এমন হয়তো আরো বহু জায়গায় হচ্ছে। যদি সঠিক জনমানুষের নেতৃত্ব না থাকে তখন এমনই হয়; এবং দিনে দিনে চোর বাড়ে। নেতৃত্ব হতে হয় স্বপ্নবিলাসী, ইমোশনাল, ন্যয়বিচারক, উদ্যোগ এবং আত্মবিশ্বাস । মানুষকে বাঁচাবার এবং হাসাবার জন্য বহু পরিকল্পনা করেন। এই মহামারীতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। আপনাদের দেখতে এবং প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে তাই আমাকে ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়’। কিন্তু হায়, আমাদের সেই নেতৃত্ব কই! কিছু নেতা দেখি ফটফট করেন অতশত কোটি টাকা হাসপাতাল, অতশত কোটি টাকা ফোরলেন- হায় রে বেক্কেলচোদা জনগণ, আমরা তখন তাদের প্রশ্ন করতে পারি না, ‘স্যার অতশত কোটি টাকা তো সব পাবলিকের ট্যাক্সের টাকা; নেতৃত্বের কাজতো অতশত কোটি টাকার হাসপাতালটি যেন সক্রিয় থাকে- মানুষ সেবা পায় সেটি গভার্ন করা। আপনি কি সেই কাজটি করতে পারেন, বা আদৌ বুঝতে পারেন?'

যদি খেয়াল করেন দেখবেন— গত কয়েকদিন নোয়াখালীর যত সমস্যা, মানুষ যা ভাবছে, যা দরকার সব তারা ডিসি অফিস নামে ফেসবুক গ্রুপে লিখছে.। এটা কী আপনাকে কোন বার্তা দেয়- একটু বুঝুন ! জ্বী, এটাই নেতৃত্ব। মানুষ মনে করছে যদি তাদের দাবি, পরামর্শ, চাহিদা এখানে জানায় তবে তা বাস্তবায়ন হবে। তারা নিজেদের কথা বলা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে তখন ‘নিজেদের নেতা’র পরিবর্তে প্রশাসনের মুখাপেক্ষী হচ্ছেন। এমনকি জেলা প্রশাসনও দেখলাম, কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মানুষের মতামত নিচ্ছেন। প্রশাসন মানুষের কতটা রাখবে জানি না, কিন্তু এই প্রকৃয়ায় মানুষ সম্মান বোধ করছে।

জ্বী এটাই নেত্বুত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব। কিন্তু ভয়ের বিষয় যতক্ষণ না জননেতৃত্ব গড়ে উঠবে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াবে— তখন এই জাতীয় প্রশাসনিক নেতৃত্বই মানুষের কাছে বিকল্প হয়ে উঠবে।

মানুষের মুক্তির জন্য মানুষের উপলব্ধি প্রয়োজন হয় সবার আগে। যতক্ষণ না সমাজে গণতান্ত্রিক জননেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারবেন ততক্ষণ আমজনতার দাবিদাওয়া, হক-ইনসাফ সবই সুদূর পরাহত।

শেষ করি, ১৯৭০ সনের ১২ নভেম্বর দিবাগত রাতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় স্মরণকালের বৃহত্তম জলোচ্ছ্বাস হয়। প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। 
জনপদের এহেন দুর্দশায় মওলানা ভাসানীকে দেখা গিয়েছিল বাড়ী বাড়ী গিয়ে খোঁজ করার। হাতিয়া, রামগতি, ভোলা, চর মনপুরা, চর আলেজান্ডার, চর জব্বার অর্থাৎ সবচে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত বিধ্বস্ত অঞ্চলে পদব্রজে দুর্দশাগ্রস্ত দুর্ভোগের মানুষগুলোকে সরেজমিন দেখেছিলেন। ২২ নভেম্বর ঢাকায় ফিরে ২৩ নভেম্বর পল্টনে জনসভা করেছিলেন। জনসভার বিবরণ রিপোর্টারের কলমে জনপদের হাহাকার ততটুকু আসেনি যতটুকু ঐ সময়ের প্রধান কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘সফেদ পাঞ্জাবি’ কবিতায় ধারণ করেছিলেন।

.. রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু, 
যেন মহাপ্লাবনের পর নূহের গভীর মুখ
সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি 
উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে। বুক তাঁর বিচূর্ণিত দক্ষিণ বাংলার 
শবাকীর্ণ হুহু উপকূল, চক্ষুদ্বয় সংহারের 
দৃশ্যাবলীময়, শোনালেন কিছু কথা, যেন নেতা
নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার। জনসমাবেশে 
সখেদে দিলেন ছুড়ে সারা খাঁ খাঁ দক্ষিণ বাংলাকে।
সবাই দেখলো চেনা পল্টন নিমিষে অতিশয় 
কর্দমাক্ত হয়ে যায়; ঝুলছে সবার কাঁধে লাশ
আমরা সবাই লাশ, বুঝি-বা অত্যন্ত রাগী কোনো
ভৌতিক কৃষক নিজে সাধের আপনকার ক্ষেত 
চকিতে করেছে ধ্বংস, পড়ে আছে নষ্ট শস্যকণা।

[এটি কোন নেতা সংক্রান্ত পোস্ট নয় ৤ দয়া করে— দলকানা, নেতাকানা পাঠক এই লেখাটি এড়িয়ে যান]